টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর ওডিআই ফরম্যাটে বিরাট কোহলির ব্যাটিংয়ে এক অভাবনীয় রূপান্তর ঘটেছে। থিরুভানন্থপুরমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ম্যাচ বিজয়ী ১৩৯* রানের ইনিংসে ওডিআই ইতিহাসে দ্বিতীয় ব্যাটার হিসেবে ১৫,০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করার পাশাপাশি কোহলি নিজের ব্যাটিংকে এক নতুন উচ্চতায় (Extra Gear) নিয়ে যাওয়ার প্রমাণ দিয়েছেন।
১. পরিসংখ্যানের আলোকে ওডিআই ক্যারিয়ারের তিন ধাপ
২০২০-এর দশকের কোহলির ওডিআই ক্যারিয়ারকে মূলত তিনটি ধাপে ভাগ করা যায়:
| সময়কাল | ইনিংস | রান | গড় | স্ট্রাইক রেট | ১০০/৫০ |
| ২০২১-২২ (কঠিন সময়) | ১৪ | ৪৩১ | ৩০.৭৯ | ৮৬.৯১ | ০ / ৪ |
| অক্টোবর ২০২৩ – অস্ট্রেলিয়া সফর | ২৪ | ১১৭২ | ৬১.৬৮ | ৮৭.৭৯ | ৪ / ৯ |
| নভেম্বর ২০২৫ – বর্তমান | ১২ | ৮৫৪ | ৮৫.৪০ | ১১৭.৬৩ | ৪ / ৪ |
দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের পর থেকে কোহলির সাম্প্রতিক ১০ ইনিংসের সমষ্টি ৮২৫ রান। এটি ওডিআই ইতিহাসের সেরা দশ-ইনিংসের রান সংগ্রাহকদের তালিকায় অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স (কোহলির নিজস্ব ২০১৮ সালের ৯৯৫ রান ও ২০১২ সালের ৮৫০ রানের পাশাপাশি)।
২. ব্যাটিং কৌশলে মূল পরিবর্তনসমূহ
- সীমানা ও ছক্কা হাঁকানোর হার:
- বাউন্ডারি ফ্রিকোয়েন্সি: ২০২১-২২ মৌসুমে প্রতি ১০.২ বলে একটি বাউন্ডারি আসত, যা বর্তমানে কমে প্রতি ৭.৩ বলে ১টি বাউন্ডারিতে দাঁড়িয়েছে।
- ছক্কা হাঁকানো: ২০২১-২২ মৌসুমে ১৭৩.৫ বলে ১টি এবং ২০২৩-২৫ পর্বে ১৩৩.৫ বলে ১টি ছক্কা হতো। সাম্প্রতিক সময়ে তা অবিশ্বাস্যভাবে কমে প্রতি ২৫ বলে ১টি ছক্কায় উন্নীত হয়েছে।
- পেস বোলিংয়ের বিরুদ্ধে আক্রমণ:
- গুড-লেংথ বলে পরিবর্তন: আগে গুড-লেংথ বলের ২৭.৯% ডিফেন্স বা লিভ করলেও বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১১%-এ। গুড-লেংথ বলে আক্রমণাত্মক শটের স্ট্রাইক রেট ১২১.৯৫ থেকে বেড়ে ১৬৮.৮৮ হয়েছে।
- ক্রিজের ব্যবহার ও স্টেপ-আউট: পেসারদের বিরুদ্ধে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে শট খেলার হার ৪.২% থেকে বেড়ে ১০.১% হয়েছে। এতে বোলারের লেংথ বিগড়ে যাচ্ছে।
- প্রথম ২০ বল ও পাওয়ারপ্লে: পেসের বিরুদ্ধে শুরুর ২০ বলে স্ট্রাইক রেট ৮০ থেকে বেড়ে ১০৯.৪৮ এবং পাওয়ারপ্লে স্ট্রাইক রেট ৭৫.৩৪ থেকে ১১০ হয়েছে।
- স্পিনের বিরুদ্ধে আগ্রাসন:
- স্পিনের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক শট খেলার হার ৪৯.৩% থেকে বেড়ে ৫৭% হয়েছে।
- প্রথম ২০ বলে স্পিনের বিরুদ্ধে স্ট্রাইক রেট ৮০.১২ থেকে বেড়ে ১০৩.৬৪ হয়েছে।
- হাওয়ায় শট (Aerial Shots) খেলার প্রবণতা ২.১% থেকে বেড়ে ১০.৫% এবং পা ব্যবহার করার হার ০.২% থেকে ৬.৮% হয়েছে।
৩. কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ
- এক ফরম্যাটের ক্রিকেট খেলার স্বাধীনতা: ২০২৫ সালের মে মাসে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর দীর্ঘমেয়াদী লাল বলের টেকনিক বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা আর নেই। ফলে আইপিএলের পাওয়ার-হিটিংয়ের আত্মবিশ্বাস সরাসরি ওডিআইতে প্রয়োগ করতে পারছেন।
- নতুন ওডিআই নিয়ম ও দলের চাহিদা: ৩৪ ওভারের পর থেকে একটি বল ব্যবহারের নিয়মে শেষের দিকে রিভার্স সুইং ও নরম বলে রান করা কঠিন। তাই শুরুর দিকে দ্রুত রান তোলা দলের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
- ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা: ইনিংসের শুরুতেই উইকেট বাঁচিয়ে খেলার মানসিকতা বদলে কোহলি এখন শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের ওপর পাল্টা আক্রমণ (Counter-attack) চালানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
৪. ২০২৭ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের প্রস্তুতি
দক্ষিণ আফ্রিকার বাউন্সি ও বৈচিত্র্যময় পিচে গুড-লেংথ বলে আক্রমণ করার এবং দ্রুত শট খেলার এই নতুন পদ্ধতি কোহলিকে বাড়তি সুবিধা দেবে। ৩৭ বছর বয়সেও ১৫,০০০ রানের অভিজ্ঞতা সাথে নিয়ে নিজের খেলাকে নতুন করে পুনর্নির্মাণ করার এই প্রচেষ্টাই কোহলিকে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটার হিসেবে অনন্য করে রেখেছে।

