২৫০ রানও যথেষ্ট হলো না! হোপের বিধ্বংসী শতরানে ভারতকে হারিয়ে সিরিজে সমতা ওয়েস্ট ইন্ডিজের
রাঁচি: সঞ্জু স্যামসনের ৮২ রান এবং শ্রেয়াস আইয়ার ও তিলক ভার্মার ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে ২৪৯ রানের বিশাল পুঁজি গড়েও জয় পেল না ভারত। শিশিরভেজা রাঁচির মাঠে শাই হোপের অপরাজিত শতরান ও শেরফেন রাদারফোর্ডের বিধ্বংসী ইনিংসে অবিশ্বাস্য রান তাড়া করে জয় ছিনিয়ে নিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে ছয় উইকেটের জয়ে পাঁচ ম্যাচের সিরিজে ১-১ সমতায় ফিরল ক্যারিবীয় দল।
ভারতের দেওয়া ২৫০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই বিপাকে পড়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। মাত্র ৫ রানে দুই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় তারা। কিন্তু এরপর ম্যাচের চিত্রটাই বদলে দেন শাই হোপ ও শেরফেন রাদারফোর্ড। হোপের অপরাজিত ১০২ রান এবং রাদারফোর্ডের ৩৭ বলে ৮৪ রানের দুরন্ত ইনিংসে ভর করে ১৮.৩ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ২৫২ রান তুলে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
পুরুষদের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সফল রান তাড়া। পাশাপাশি ওয়েস্ট ইন্ডিজের টি-টোয়েন্টি ইতিহাসে সর্বোচ্চ সফল রান তাড়ার নজিরও গড়ল এই জয়।
ম্যাচে দুই দল মিলিয়ে উঠেছে ৫০১ রান, যা পুরুষদের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মিলিত রানসংখ্যা। তবে দুই দলের পার্থক্য গড়ে দিয়েছে ছক্কার হিসাব। ভারত যেখানে ১৩টি ছক্কা মেরেছে, সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটাররা হাঁকিয়েছেন ২০টি। এর মধ্যে একাই ৯টি ছক্কা মেরেছেন হোপ।
স্যামসনের ব্যাটে ঝড়, শেষ দিকে আইয়ার-তিলকের তাণ্ডব
টস জিতে ভারতকে প্রথমে ব্যাট করতে পাঠিয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক শাই হোপ। শুরুতে অবশ্য ফিল্ডিংয়ে একাধিক সুযোগ নষ্ট করে ভারতকে বড় রান তোলার রাস্তা করে দেয় ক্যারিবীয় দল।
ফর্মের খোঁজে থাকা সঞ্জু স্যামসন শুরুতে কিছুটা অস্বস্তিতে থাকলেও দ্রুত ছন্দ ফিরে পান। কাইল মায়ার্সের পরিবর্তে? না, কভার অঞ্চলে কামিল পুরানের হাতে ক্যাচ পড়ার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার পরই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন তিনি। আকিল হোসেনের বলে ফ্রি-হিট কাজে লাগিয়ে লং-অনের ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকান স্যামসন।
এরপর আকিলের এক ওভারে দুটি ছক্কা ও দুটি চার মেরে ২২ রান তুলে নেন তিনি। মাঝপথে আরও একটি ক্যাচ পড়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে মাত্র ২১ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন স্যামসন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে কোনও ভারতীয় ব্যাটারের দ্রুততম অর্ধশতরানের নজিরেও যৌথভাবে জায়গা করে নেন তিনি।
অন্য প্রান্তে নিজের ঘরের মাঠে দুরন্ত ব্যাটিং করেন ঈশান কিষাণ। মাত্র ২২ বলে ৪৩ রান করেন তিনি। স্যামসন ও কিষাণের জুটিতে মাত্র ৪৩ বলে ওঠে ৯৭ রান। ফলে ১০ ওভারের শেষে ভারতের সংগ্রহ দাঁড়ায় ১২৭/১।
তবে এরপর ম্যাচে ফিরে আসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। রস্টন চেজের অফস্পিনে চাপে পড়ে ভারত। ২৪ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ভারতীয় ব্যাটিংয়ের গতি কমিয়ে দেন চেজ। তাঁর শিকার হন ঈশান কিষাণ ও শিবম দুবে। অন্যদিকে, শামার স্প্রিঙ্গারের ধীরগতির বলে বড় শট খেলতে গিয়ে ৮২ রানে আউট হন স্যামসন।
১১ থেকে ১৫ ওভারের মধ্যে মাত্র ৪২ রান তুলতে পারে ভারত। ফলে বড় স্কোরের সম্ভাবনা কিছুটা ধাক্কা খায়।
কিন্তু শেষ পাঁচ ওভারে পাল্টে যায় ছবিটা।
শ্রেয়াস আইয়ার ও তিলক ভার্মা মিলে শেষ পাঁচ ওভারে তুলে নেন ৮০ রান। নিজের প্রথম টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক শতরানের পর দুর্দান্ত ছন্দে থাকা আইয়ার ১৮ বলে ৪০ রান করেন। তিলক আরও বিধ্বংসী। মাত্র ১৮ বলে অপরাজিত ৪৪ রান করে ভারতকে ২৪৯/৫-এ পৌঁছে দেন তিনি। ইনিংসের শেষ ওভারে স্প্রিঙ্গারের প্রথম তিন বলেই ছক্কা হাঁকান তিলক।
শুরুতেই ধাক্কা, কিন্তু হোপ-রাদারফোর্ডের ঝড়ে উড়ে গেল ভারত
২৫০ রানের লক্ষ্য রক্ষা করতে নেমে দুর্দান্ত শুরু করেছিল ভারত। প্রথম ওভারেই মায়াঙ্ক যাদবের বলে পুরান ক্যাচ তুলে দেন। এরপর ১৪৪ কিমি প্রতি ঘণ্টা গতির ডেলিভারিতে প্রথম বলেই শিমরন হেটমায়ারকে বোল্ড করেন মায়াঙ্ক।
মাত্র ৫ রানে ২ উইকেট হারিয়ে তখন চাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু সেখান থেকেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন শাই হোপ।
অক্ষর প্যাটেলের এক ওভারে দুটি ছক্কা ও একটি চার মেরে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন তিনি। রভম্যান পাওয়েলও দ্রুত রান তুলছিলেন। ১৩ বলে ২৪ রান করার পর মায়াঙ্কের বলে বোল্ড হন পাওয়েল।
এরপর ক্রিজে আসেন শেরফেন রাদারফোর্ড। প্রথম চার বলের মধ্যে তিনটিকেই সীমানার বাইরে পাঠিয়ে নিজের আগমনের বার্তা দেন তিনি। পাওয়ারপ্লের শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোর দাঁড়ায় ৭২/৩। অর্থাৎ, প্রয়োজনীয় রান তোলার গতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই এগোচ্ছিল ক্যারিবীয়রা।
৫৪ বলে ১২০ রানের জুটি, দিশেহারা ভারতের বোলাররা
হোপ ও রাদারফোর্ডের জুটি ভারতীয় বোলিংকে কার্যত ছিন্নভিন্ন করে দেয়। মাত্র ২৪ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন হোপ। অন্যদিকে, ৩৯ রানে থাকাকালীন মায়াঙ্ক যাদবের বলে ক্যাচ পড়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন রাদারফোর্ড।
ভারতীয় বোলাররা অফ স্টাম্পের বাইরে বল রেখে রান আটকে দেওয়ার চেষ্টা করলেও বিশেষ লাভ হয়নি। অক্ষর প্যাটেলের ১২তম ওভারে ওঠে ২৩ রান। পরের ওভারে নীতিশ কুমার রেড্ডি নয়, নামান ধীরের বলে আসে আরও ১৮ রান।
মাত্র ২৪ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন রাদারফোর্ড। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এটি তাঁর টানা তৃতীয় অর্ধশতাধিক ইনিংস।
শেষ পর্যন্ত ৫৪ বলে ১২০ রানের দুরন্ত জুটি গড়েন হোপ ও রাদারফোর্ড। ১৫তম ওভারে কুলদীপ যাদবের বলে রাদারফোর্ড আউট হলেও তখনও জয়ের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৩৫ বলে ৭২ রান।
ভারতের সামনে ম্যাচে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি তারা।
রোমারিও শেফার্ডের ঝড়ে শেষ হয়ে গেল ভারতের আশা
রাদারফোর্ড আউট হওয়ার পর ব্যাট করতে নামেন রোমারিও শেফার্ড। প্রথম ইনিংসে চোটের কারণে মাঠ ছেড়ে যাওয়া শেফার্ড ব্যাট হাতে নেমেই ভারতীয় বোলারদের ওপর চড়াও হন।
কুলদীপ যাদবের ১৭তম ওভারে ওঠে ২৪ রান। হোপ দুবার লং-অফের ওপর দিয়ে ছক্কা মারেন। শেফার্ডও হাঁটু মুড়ে মিড-উইকেটের ওপর দিয়ে বল পাঠিয়ে দেন গ্যালারিতে।
এরপর অর্শদীপ সিংয়ের ১৮তম ওভারে আসে ১৭ রান। ফলে ম্যাচ কার্যত ভারতের হাতের বাইরে চলে যায়।
জয়ের জন্য যখন ১২ বলে মাত্র ১০ রান প্রয়োজন, তখন অক্ষর প্যাটেলের ওভারেই খেলা শেষ করে দেন হোপ। প্রথমে স্লগ-সুইপ করে ছক্কা মেরে ৯৬ রানে পৌঁছন তিনি। এরপর লং-অফের ওপর দিয়ে আরও একটি ছক্কা হাঁকিয়ে পূর্ণ করেন শতরান। একই সঙ্গে নিশ্চিত করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের অবিশ্বাস্য জয়।
ম্যাচের সংক্ষিপ্ত স্কোর
ভারত: ২৪৯/৫ (২০ ওভার)
সঞ্জু স্যামসন ৮২, তিলক ভার্মা ৪৪*, ঈশান কিষাণ ৪৩।
রস্টন চেজ ৩/২৪, শামার স্প্রিঙ্গার ২/৬৪।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ২৫২/৪ (১৮.৩ ওভার)
শাই হোপ ১০২*, শেরফেন রাদারফোর্ড ৮৪, রোমারিও শেফার্ড ৩৪*।
মায়াঙ্ক যাদব ৩/৩৬।
ফলাফল: ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৬ উইকেটে জয়ী।
সিরিজ: পাঁচ ম্যাচের সিরিজে ১-১ সমতা।

