ট্রাভিস হেডকে নিয়ে প্রচলিত ধারণা কতটা সত্য? নিজেই দিলেন চমকপ্রদ উত্তর
অস্ট্রেলিয়ার তারকা ব্যাটার ট্রাভিস হেডকে নিয়ে ক্রিকেটবিশ্বে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—তিনি নাকি খুব বেশি হিসাব-নিকাশ না করেই ব্যাট হাতে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। পরিস্থিতি বুঝে ঝুঁকি নেওয়ার বদলে যেন সবসময়ই বোলারদের ওপর চড়াও হতে চান।
তবে হেড নিজেই বলছেন, বাস্তবতা এর পুরোপুরি উল্টো।
বাইরে থেকে যতটা ‘বেপরোয়া’ মনে হয়, ভেতরে তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পনামাফিক ক্রিকেট খেলেন। প্রতিপক্ষের বোলারদের নিয়ে বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে নিজের ব্যাটিংয়ের প্রস্তুতি—সবকিছুতেই তার রয়েছে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা।
ঘুম হারাম হয়েছিল প্রতিপক্ষের বোলারদের জন্য
বাংলাদেশের বিপক্ষে ডারউইনে টেস্ট খেলার আগের রাতে ঘুমাতে পারেননি হেড। কারণ বাংলাদেশের পেসারদের অনেককেই এর আগে তিনি মোকাবিলা করেননি। ফলে তাদের রান-আপ, বোলিং অ্যাকশন ও বল ছাড়ার জায়গা সম্পর্কে তার কাছে পর্যাপ্ত ধারণা ছিল না।
সমস্যার সমাধানও বের করে ফেলেছিলেন হেড। ম্যাচের দিন মাঠে নিজের নিয়মিত দৌড়ের সময়টি এমনভাবে ঠিক করেছিলেন, যাতে বাংলাদেশের পেসারদের ওয়ার্ম-আপ কাছ থেকে দেখতে পারেন। উদ্দেশ্য ছিল তাদের বোলিং অ্যাকশন ও রিলিজ পয়েন্ট সম্পর্কে দ্রুত ধারণা নেওয়া।
দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমেও একই ধরনের প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে তাকে। এমনকি সেটি ছিল একটি প্রস্তুতি ম্যাচ, যেখানে প্রতিপক্ষের বোলারদের নিয়ে খুব বেশি চিন্তার কারণ ছিল না। তারপরও নিজের প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি রাখতে চাননি হেড।
‘মানুষ আমাকে যেভাবে দেখে, আমি আসলে তার বিপরীত’
হেডের মতে, তাকে নিয়ে বাইরে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, সেটি তার প্রকৃত ব্যক্তিত্ব ও প্রস্তুতির সঙ্গে অনেকটাই সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, মানুষ তার ব্যাটিং দেখে যেভাবে ব্যাখ্যা করে, বাস্তবে তার প্রস্তুতি প্রায় তার বিপরীত। তবে এই ভুল ধারণাটাকে তিনি খারাপও মনে করেন না।
তার ভাষায়, কিছুটা ‘মিথ’ তাকে ঘিরে থাকলে সেটি বরং ভালো। এতে প্রতিপক্ষও তাকে নিয়ে সবসময় নিশ্চিত হতে পারে না।
হেড জানান, তিনি ব্যাটিং নিয়ে অনেক চিন্তা করেন এবং নিজের প্রস্তুতিকে যতটা সম্ভব ধারাবাহিক রাখতে চান। প্রয়োজন হলে দলের অন্যদের কাছ থেকেও পরামর্শ নেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে অন্যদের মতামতকে গুরুত্ব দেন।
‘আমি আসলে খুব কম ঝুঁকি নিই’
ট্রাভিস হেডের সবচেয়ে বড় চমকপ্রদ বক্তব্য এসেছে ঝুঁকি নেওয়ার প্রসঙ্গে।
বাইরে থেকে তার ব্যাটিংকে অনেকেই উচ্চঝুঁকির ক্রিকেট বলে মনে করেন। কিন্তু হেডের দাবি, তিনি বরং খুব কম ঝুঁকি নিয়ে ব্যাটিং করেন।
তিনি বলেন, প্রতিটি শট খেলার আগে তিনি ঝুঁকি ও সম্ভাব্য লাভ—দুটিই হিসাব করেন। দর্শকদের কাছে কোনো শটকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও তার কাছে সেটিই রান করার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হতে পারে।
ওয়ানডেতে বোলারের মাথার ওপর দিয়ে বা বাতাসে বল তুলে মারার ক্ষেত্রেও একই হিসাব কাজ করে। তার কাছে সেটি কোনো অন্ধ আক্রমণ নয়, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী হিসাব করা সিদ্ধান্ত।
প্রতিপক্ষের চেয়ে নিজের ব্যাটিং নিয়েই বেশি ভাবেন
হেড সাধারণত প্রতিপক্ষের সব বোলারকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও বিশ্লেষণ করেন না। যাদের বিপক্ষে তার অভিজ্ঞতা কম, মূলত তাদের নিয়েই বেশি প্রস্তুতি নেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার কাগিসো রাবাদা, আনরিখ নরকিয়া কিংবা কেশব মহারাজের মতো পরিচিত বোলারদের নিয়ে তাকে অতিরিক্ত ভাবতে হয় না। তবে ড্যান প্যাটারসনের মতো যেসব বোলারের বিপক্ষে তার অভিজ্ঞতা কম, তাদের কিছু ভিডিও তিনি দেখেন।
তবে তার প্রস্তুতির বড় অংশজুড়েই থাকে নিজের পুরোনো ইনিংস।
ভালো খেলা ম্যাচগুলোর ভিডিও ইউটিউবে দেখে নিজের সফল ব্যাটিংয়ের অনুভূতিটা আবার ফিরিয়ে আনেন হেড। কোন পরিবেশে কীভাবে ব্যাট করেছিলেন, সেটি তার মানসিক প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভুল থেকেও দ্রুত শেখেন হেড
সাম্প্রতিক সময়ে হেডের একটি সমস্যা ছিল ‘চপ অন’ হয়ে বোল্ড হওয়া। ধীরগতির উইকেটে এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে বলে মনে হয়েছিল।
পচেফস্ট্রুমের প্রস্তুতি ম্যাচে তাই নিজের ব্যাটিং পজিশনেও পরিবর্তন আনেন তিনি। সাধারণত স্টাম্পের কাছাকাছি থেকে ব্যাট করলেও ধীর উইকেটে ক্রিজ থেকে একটু বাইরে এসে ব্যাট করেন।
তার মতে, এতে ব্যাটে বল লাগানোর সময় আরও নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যায় এবং বল ভেতরের দিকে ঢুকে স্টাম্পে আঘাত করার ঝুঁকি কমে।
হেডের কাছে বিষয়টি খুব সহজ—সবসময় একইভাবে ব্যাট করলে হবে না। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে পরিবর্তন করার মানসিকতা থাকতে হবে।
নেটে অল্প সময়, কিন্তু পুরোপুরি মনোযোগ
স্টিভ স্মিথ বা মার্নাস লাবুশেনের মতো অস্ট্রেলিয়ার অনেক ব্যাটার দীর্ঘ সময় নেটে ব্যাট করেন। হেডের অনুশীলন তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও তাতে মনোযোগের কোনো ঘাটতি নেই।
বিশেষ করে দ্রুতগতির বোলারদের বিপক্ষে তিনি ১০ থেকে ১৫ মিনিটের ছোট সেশন পছন্দ করেন।
তার লক্ষ্য খুব পরিষ্কার—অল্প সময়ের মধ্যে নিজের ব্যাটিংকে যতটা সম্ভব ধারালো করে তোলা এবং ম্যাচের জন্য প্রস্তুত অনুভব করা।
নেটে আউট হয়ে যাওয়াও তার কাছে বিরক্তিকর। এমনকি অনুশীলনের সময় জশ হ্যাজলউডের বলে ক্যাচ দিয়ে আউট হওয়ার পর তাকে হতাশ হতে দেখা গেছে।
সবসময় একই প্রস্তুতি নয়
টেস্ট ম্যাচের আগে প্রতিদিন কঠোর অনুশীলন করতেই হবে—এমন কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম হেডের নেই।
কখনো তিনি প্রতিদিন অনুশীলন করেন, আবার কখনো ম্যাচের আগে খুব কম অনুশীলন করেও মাঠে নামেন।
তার মতে, প্রস্তুতি অনেকটাই নির্ভর করে নিজের অনুভূতির ওপর। কখনো শুধু মাঠে হাঁটাহাঁটি করা, কিট ব্যাগ গুছিয়ে রাখা কিংবা পরের দিন ম্যাচ—এই অনুভূতিটা নিজের মধ্যে তৈরি করাও যথেষ্ট।
একবার নিজেকে প্রস্তুত মনে হলে তিনি তখন বিশ্রাম নিতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
মাঠের বাইরে হাসিখুশি, কিন্তু ক্রিকেটে ভীষণ সিরিয়াস
ট্রাভিস হেডের আরেকটি পরিচিত দিক হলো তার প্রাণবন্ত ও মজার স্বভাব। টেস্ট জয়ের পর অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুমের উদযাপনে তাকে প্রায়ই সামনে দেখা যায়।
এই স্বভাবের কারণেই তিনি অস্ট্রেলিয়ায় এক ধরনের ‘কাল্ট হিরো’ হয়ে উঠেছেন।
কিন্তু তার এই হাসিখুশি চরিত্র দেখে কেউ যেন তাকে ক্রিকেটে হালকা মানসিকতার খেলোয়াড় মনে না করেন।
নেটে ব্যাটিংয়ের সময় অতিরিক্ত কথা বলা বা মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটানো একদমই পছন্দ করেন না হেড। তিনি চান সবকিছু একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে হোক এবং তার মনোযোগ যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়।
মজা আর সিরিয়াসনেসের মধ্যে ভারসাম্য
হেড স্বীকার করেন, গত তিন-চার বছরে ক্রিকেট খেলতে তিনি অনেক বেশি আনন্দ পাচ্ছেন। তবে আনন্দ করার পাশাপাশি মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়াও তিনি চান না।
তার মতে, ক্রিকেট ক্যারিয়ারের জন্য এতটা সময় ও ত্যাগ স্বীকার করার পর খেলাটাকে উপভোগ করাও জরুরি। কিন্তু অতিরিক্ত মজা করতে গিয়ে যেন মূল কাজটি ভুলে না যান, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, ট্রাভিস হেডের ক্রিকেট দর্শন অনেকটা এমন—মাঠে আনন্দ থাকবে, কিন্তু লক্ষ্য থেকে মনোযোগ এক মুহূর্তের জন্যও সরবে না।
আর এই কারণেই হয়তো মাঠে তার ব্যাটিং যতটা স্বতঃস্ফূর্ত ও বেপরোয়া মনে হয়, তার পেছনের প্রস্তুতি ততটাই হিসাবি ও সুপরিকল্পিত।
দক্ষিণ আফ্রিকার কঠিন কন্ডিশনে সামনে অপেক্ষা করছে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার আগে হেডের হয়তো আরও একটি-দুটি নির্ঘুম রাত কাটবে—তবে মাঠে নামার সময় তিনি যে পুরোপুরি প্রস্তুত থাকবেন, সেটি নিয়ে সন্দেহ নেই।
