CricBengal.com | ক্রিকেট
টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার কে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে বেশ কয়েকটি কিংবদন্তি নাম। স্যার গারফিল্ড সোবার্স, জ্যাক ক্যালিস, ইমরান খান, রিচার্ড হ্যাডলি, কপিল দেব ও ইয়ান বোথামের মতো ক্রিকেটাররা দীর্ঘদিন ধরেই এই আলোচনায় রয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বেন স্টোকসের অসাধারণ পারফরম্যান্সও তাঁকে এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে তুলেছে।
ব্যাট হাতে রান করার পাশাপাশি বল হাতে উইকেট নেওয়া—একজন প্রকৃত অলরাউন্ডারের পরিচয় এখানেই। তবে শুধু মোট রান কিংবা উইকেটের সংখ্যা দিয়ে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার নির্বাচন করা কতটা যুক্তিযুক্ত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডারদের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করা হয়েছে বিভিন্ন পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে।
স্টোকস, সোবার্স ও ক্যালিসের বিশেষ কৃতিত্ব
টেস্ট ক্রিকেটের প্রায় দেড়শ বছরের ইতিহাসে মাত্র তিনজন ক্রিকেটার অন্তত ৭ হাজার রান ও ২০০ উইকেটের অনন্য কীর্তি গড়েছেন। তাঁরা হলেন স্যার গারফিল্ড সোবার্স, জ্যাক ক্যালিস ও বেন স্টোকস।
এই পরিসংখ্যানই তাঁদের অলরাউন্ডার হিসেবে অসাধারণ দক্ষতার প্রমাণ দেয়। ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর থাকা যে কতটা কঠিন, তাঁদের অর্জন তারই উদাহরণ।
স্টোকস আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেওয়ার পর তাঁকে সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সর্বকালের সেরার প্রশ্নে সোবার্স ও ক্যালিসের মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে তুলনা করতে হলে আরও বিস্তৃত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
সেরা অলরাউন্ডার বাছাইয়ের মানদণ্ড কী?
এই বিশ্লেষণে প্রথমে এমন ক্রিকেটারদের বিবেচনা করা হয়েছে, যাঁরা টেস্ট ক্রিকেটে অন্তত ২ হাজার রান ও ১০০ উইকেট অর্জন করেছেন। এই শর্ত পূরণ করেছিলেন মোট ৩৬ জন ক্রিকেটার।
তবে শুধু দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সুবাদে অলরাউন্ডার হিসেবে পরিসংখ্যানের মাইলফলক ছুঁয়েছেন—এমন কয়েকজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ব্যাটিং গড় ২০-এর নিচে থাকা শেন ওয়ার্ন, অনিল কুম্বলে, স্টুয়ার্ট ব্রড, হরভজন সিং ও টিম সাউদিকে বাদ দেওয়া হয়। একইভাবে ৪৫-এর বেশি বোলিং গড় থাকা কার্ল হুপারও চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা পাননি।
এর ফলে প্রাথমিক তালিকা থেকে বাদ পড়েন ছয়জন। বাকি ৩০ জনকে বিভিন্ন মানদণ্ডে বিশ্লেষণ করা হয়।
শুধু রান ও উইকেট নয়, বিবেচনায় আরও অনেক কিছু
একজন প্রকৃত অলরাউন্ডারকে শুধু তাঁর মোট রান কিংবা উইকেট দিয়ে বিচার করা যায় না। ব্যাটিং ও বোলিংয়ের গড়, দলের সাফল্যে অবদান, ঘরের মাঠ ও বিদেশের পারফরম্যান্স এবং দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকতা—সবকিছুকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও দেখা হয়েছে, একজন ক্রিকেটার তাঁর দলের মোট রানের কত শতাংশ করেছেন এবং দলের মোট উইকেটের কত শতাংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি দল জেতার ম্যাচগুলোতে তাঁর অবদানও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া এমন সময়কালও বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যখন একজন ক্রিকেটার টানা একাধিক টেস্টে ৪০ বা তার বেশি ব্যাটিং গড় এবং ৩০-এর নিচে বোলিং গড় বজায় রেখেছেন।
রান ও উইকেটের সম্মিলিত পরিসংখ্যানে ক্যালিস এগিয়ে
মোট রান ও উইকেটের সম্মিলিত পরিসংখ্যানে জ্যাক ক্যালিস বিশেষভাবে এগিয়ে রয়েছেন। টেস্ট ক্রিকেটে ১৫ হাজার ৯২১ রান নিয়ে শচীন টেন্ডুলকার সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক, আর ৮০০ উইকেট নিয়ে মুথাইয়া মুরালিধরন সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি।
তবে অলরাউন্ডারদের মূল্যায়নে ব্যাটিং ও বোলিংয়ের সম্মিলিত অবদান বিবেচনা করলে ক্যালিসের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। টেস্টে তাঁর রান ও উইকেটের সমন্বয় তাঁকে এই বিশ্লেষণের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার হিসেবে তুলে ধরেছে।
এই বিভাগে রবিচন্দ্রন অশ্বিনও উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছেন। তাঁর ৫৩৭টি টেস্ট উইকেট তাঁকে অলরাউন্ডারদের মধ্যে বিশেষ জায়গা দিয়েছে। কপিল দেব, ইয়ান বোথাম, সোবার্স ও বেন স্টোকসও রান ও উইকেটের সম্মিলিত পরিসংখ্যানে উল্লেখযোগ্য।
দলের জয়ে অবদানে শীর্ষে কারা?
দলের জয়ে অবদান রাখার ক্ষেত্রে ভিনু মানকড়, রিচার্ড হ্যাডলি, গারফিল্ড সোবার্স, সাকিব আল হাসান ও ইয়ান বোথামের নাম উঠে এসেছে সেরা পাঁচে।
নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট ইতিহাসে হ্যাডলির অবদান ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ক্যারিয়ারের সময় নিউজিল্যান্ড টেস্ট ক্রিকেটে আগের তুলনায় অনেক বেশি সাফল্য পেতে শুরু করে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের সাকিব আল হাসানও এই বিশ্লেষণে উল্লেখযোগ্য অবস্থান অর্জন করেছেন। দলের জয়ে ব্যাট ও বল হাতে তাঁর অবদান তাঁকে ঐতিহাসিক অলরাউন্ডারদের সঙ্গে একই আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
ধারাবাহিকতায় নজরকাড়া রবীন্দ্র জাদেজা ও ইমরান খান
টেস্ট ক্রিকেটে ব্যাটিং গড় ৪০-এর বেশি এবং বোলিং গড় ৩০-এর নিচে রেখে দীর্ঘ সময় পার করার ক্ষেত্রে রবীন্দ্র জাদেজা ও ইমরান খানের পারফরম্যান্স বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জাদেজা টানা ৮২টি টেস্টে এই মানদণ্ড বজায় রেখেছেন। অন্যদিকে, ইমরান খান ৮১টি টেস্টে একই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। তাঁর ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতা ক্যারিয়ারের ৯২.০৫ শতাংশ টেস্ট ম্যাচজুড়ে বিস্তৃত ছিল।
জাদেজার ক্ষেত্রে এই হার ৯০.১১ শতাংশ। অর্থাৎ, শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি ম্যাচে ভালো করা নয়, দীর্ঘ সময় ধরে দুই বিভাগেই কার্যকর থাকার বিষয়টিও সেরা অলরাউন্ডার নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ।
ঘরের মাঠ ও বিদেশে পারফরম্যান্সেও ইমরান খানের কৃতিত্ব
ঘরের মাঠ ও বিদেশের ম্যাচে পারফরম্যান্সের তুলনায় ইমরান খান বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। এই বিভাগে তাঁর ব্যাটিং ও বোলিংয়ের পরিসংখ্যান তাঁকে অন্য অলরাউন্ডারদের তুলনায় এগিয়ে রেখেছে।
ইমরান খানের টেস্ট ক্যারিয়ারে ব্যাট হাতে ৩ হাজার ৮০৭ রান এবং বল হাতে ৩৬২ উইকেট রয়েছে। তাঁর ব্যাটিং ও বোলিংয়ের পাশাপাশি দলের জয়ে অবদান, ধারাবাহিকতা এবং বিভিন্ন পরিবেশে কার্যকর থাকার ক্ষমতাও মূল্যায়নে গুরুত্ব পেয়েছে।
তাহলে সর্বকালের সেরা কে?
সর্বকালের সেরা টেস্ট অলরাউন্ডার নির্বাচন করতে গিয়ে শুধু একটি পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। মোট রান ও উইকেটের হিসাবে ক্যালিস, ব্যাটিং-বোলিংয়ের ভারসাম্যে সোবার্স, দলের জয়ে অবদানে হ্যাডলি ও সাকিব এবং ধারাবাহিকতায় ইমরান খান ও জাদেজার মতো ক্রিকেটাররা নিজেদের বিশেষত্ব তুলে ধরেছেন।
এই গবেষণায় বিভিন্ন মানদণ্ডকে সমান গুরুত্ব দিয়ে অলরাউন্ডারদের জন্য একটি সম্মিলিত স্কোর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে উপলব্ধ প্রতিবেদনের অংশে চূড়ান্ত তালিকার সম্পূর্ণ ফলাফল দেখা যাচ্ছে না। তাই সব বিবেচনায় কে প্রথম হয়েছেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
একটি বিষয় অবশ্য স্পষ্ট—সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু রান ও উইকেট নয়, ধারাবাহিকতা, দলের সাফল্যে অবদান এবং ঘরের মাঠ ও বিদেশে পারফরম্যান্সও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

