CricBengal.com | আন্তর্জাতিক ফুটবল
প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০২৬
ফুটবল বিশ্বে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। দুজনই নিজেদের অসাধারণ পারফরম্যান্সে ভেঙেছেন একের পর এক রেকর্ড। তবে বয়স ৩০ পেরোনোর পর কে বেশি কার্যকর ছিলেন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে চমকপ্রদ কিছু পরিসংখ্যান।
একদিকে রোনালদোর গোল করার অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে মেসির গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর দক্ষতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুজনের খেলার ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, সামগ্রিক কার্যকারিতার বিচারে কিছুটা এগিয়ে মেসি।
গোল ও অ্যাসিস্টে কার দাপট বেশি?
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩০ বছর বয়স পার হওয়ার পর মেসি খেলেছেন ৪৮০টি ম্যাচ। এই সময়ে তাঁর গোল ৩৭১টি এবং অ্যাসিস্ট ১৯৬টি।
অন্যদিকে, রোনালদো খেলেছেন ৬২২টি ম্যাচ। তাঁর গোলসংখ্যা ৫১৮, সঙ্গে রয়েছে ১০৬টি অ্যাসিস্ট।
মোট গোল ও অ্যাসিস্ট যোগ করলে রোনালদোর অবদান ৬২৪টি, আর মেসির ৫৬৭টি। অর্থাৎ, মোট সংখ্যায় এগিয়ে পর্তুগিজ মহাতারকা।
তবে ম্যাচপ্রতি অবদানের হিসাব করলে চিত্রটা বদলে যায়। মেসির ম্যাচপ্রতি গোল ও অ্যাসিস্টের গড় প্রায় ১.১৮, যেখানে রোনালদোর গড় ১.০০।
অর্থাৎ, তুলনামূলক কম ম্যাচ খেলেও প্রতি ম্যাচে বেশি গোলের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন মেসি।
গোল করার লড়াইয়ে রোনালদো, সৃষ্টিশীলতায় মেসি
শুধু গোলের হিসাবে রোনালদো এগিয়ে। ৩০ বছরের পর তাঁর গোল ৫১৮টি, মেসির ৩৭১টি। তবে বেশি ম্যাচ খেলার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি।
পেনাল্টি থেকে রোনালদোর গোল ১১০টি, আর মেসির ৪১টি। পেনাল্টি বাদ দিলেও রোনালদোর গোলসংখ্যা বেশি। তবে ফ্রি-কিক থেকে গোল করার ক্ষেত্রে এগিয়ে মেসি। এই সময়ে তাঁর ফ্রি-কিক গোল ৪৩টি, রোনালদোর ২২টি।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য অ্যাসিস্টে। সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রে মেসি অনেক এগিয়ে। ফলে তাঁর অবদান শুধু গোল করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আক্রমণ তৈরি করা এবং সতীর্থদের গোলের সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ক্লাব ফুটবলে দুই তারকার ভিন্ন পথ
ক্লাব ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানেও দুজনের মধ্যে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য।
রিয়াল মাদ্রিদে ৩০ বছর পার হওয়ার পর রোনালদো ১৬১ ম্যাচে করেছেন ১৬২ গোল। ম্যাচপ্রতি গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে তাঁর অবদান ছিল প্রায় ১.২৭।
পরবর্তী সময়ে জুভেন্টাস ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে তাঁর পারফরম্যান্সে ওঠানামা দেখা যায়। আল নাসরে গিয়েও গোল করার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন তিনি।
মেসির ক্ষেত্রে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বার্সেলোনায় ৩০ বছরের পর ১৯৫ ম্যাচে তিনি করেছেন ১৬৫ গোল এবং ৭৪টি অ্যাসিস্ট।
প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ে তাঁর পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম ছিল। তবে ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর আবারও দুর্দান্ত ছন্দে ফেরেন আর্জেন্টাইন তারকা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হিসাব অনুযায়ী, ইন্টার মায়ামির হয়ে ১২০ ম্যাচে মেসির গোল ১০৬টি এবং অ্যাসিস্ট ৫৭টি। অর্থাৎ, বয়স বাড়লেও তাঁর আক্রমণাত্মক অবদান কমেনি।
অবশ্য দুটি ভিন্ন লিগের পারফরম্যান্স তুলনা করার সময় প্রতিযোগিতার মান, দলের শক্তি এবং খেলার পরিবেশও বিবেচনা করতে হবে।
শিরোপার লড়াইয়ে কে এগিয়ে?
শুধু ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান নয়, দলীয় সাফল্যের হিসাবেও দুই তারকার মধ্যে রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
৩০ বছর বয়স পার হওয়ার পর রোনালদো রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে একাধিক বড় শিরোপা জিতেছেন। পর্তুগালের হয়ে ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয় তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অর্জন।
মেসির সাফল্যের তালিকাও সমৃদ্ধ। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ জয় তাঁর ক্যারিয়ারকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।
ব্যক্তিগত পুরস্কারের হিসাবেও এগিয়ে মেসি। ৩০ বছর পার হওয়ার পর তিনি তিনবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন—২০১৯, ২০২১ ও ২০২৩ সালে। একই সময়ে রোনালদো এই পুরস্কার জিতেছেন দুবার—২০১৬ ও ২০১৭ সালে।
বিশেষ করে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয় মেসির ক্যারিয়ারে এমন একটি অর্জন, যা তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের সেরাদের আলোচনায় আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছে।
ফাইনালে কার প্রভাব বেশি?
বড় ম্যাচে পারফরম্যান্সের বিচারে দুজনই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফাইনালে গোল করার ক্ষেত্রে রোনালদো এগিয়ে থাকলেও অ্যাসিস্টে মেসির ব্যবধান অনেক বেশি।
রোনালদোর ফাইনালে গোলসংখ্যা ১৪, আর মেসির ১০। অন্যদিকে, ফাইনালে মেসির অ্যাসিস্ট ৯টি, যেখানে রোনালদোর অ্যাসিস্টের সংখ্যা শূন্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের গোলের সুযোগ তৈরি করেও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্রভাব রেখেছেন মেসি।
তবে ফাইনালের সংখ্যা, প্রতিযোগিতার ধরন ও ম্যাচে খেলার সময়ের পার্থক্য বিবেচনা না করে শুধু এই সংখ্যার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না।
বয়স বাড়লেও থামেনি দুই মহাতারকার দাপট
সাধারণত ফুটবলারদের ক্যারিয়ারে ৩০ বছর পার হওয়ার পর গতি ও শারীরিক সক্ষমতার পরিবর্তন দেখা যায়। অনেক খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে গোল করার ধারাবাহিকতাও কমে আসে।
কিন্তু মেসি ও রোনালদো নিজেদের খেলার ধরন বদলে দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করার উদাহরণ তৈরি করেছেন।
রোনালদো নিজের শারীরিক সক্ষমতা, পজিশনিং এবং গোল করার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে গোলমেশিন হিসেবে পরিচিতি ধরে রেখেছেন। অন্যদিকে, মেসি গোল করার পাশাপাশি মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ পরিচালনা, নিখুঁত পাস এবং সুযোগ তৈরির মাধ্যমে নিজের ভূমিকা আরও বিস্তৃত করেছেন।
দুজনের পথ আলাদা হলেও লক্ষ্য ছিল একই—দীর্ঘ সময় ধরে দলের জন্য কার্যকর থাকা।
তাহলে ৩০ পেরিয়ে কে সেরা?
পরিসংখ্যানের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট গোল ও মোট গোল-অবদানে রোনালদো এগিয়ে। দীর্ঘ সময় ধরে বেশি ম্যাচ খেলা এবং গোল করার ধারাবাহিকতা তাঁর বড় শক্তি।
অন্যদিকে, ম্যাচপ্রতি গোল-অবদান, অ্যাসিস্ট এবং ফ্রি-কিক থেকে গোল করার ক্ষেত্রে মেসির পারফরম্যান্স তাঁকে এগিয়ে রাখে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্বকাপ জয়ও মেসির পক্ষে একটি বড় যুক্তি।
তবে দুজনের খেলার ধরন, পজিশন, লিগ এবং দলের ভূমিকা এক নয়। তাই শুধু কয়েকটি পরিসংখ্যান দিয়ে একজনকে নিঃশর্তভাবে অন্যজনের চেয়ে সেরা ঘোষণা করা কঠিন।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, গোলের ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘায়ুর প্রতীক রোনালদো, আর গোল করা ও গোলের সুযোগ তৈরি—দুই ক্ষেত্রেই অসাধারণ কার্যকারিতার উদাহরণ মেসি।
বয়স ৩০ পেরিয়ে দুজনই প্রমাণ করেছেন, ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা নেই।

