CricBengal.com | আন্তর্জাতিক ক্রিকেট
ওয়ানডে ক্রিকেটে ব্যাট ও বলের লড়াইয়ে ভারসাম্য ফেরাতে চালু করা নতুন নিয়মের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে ইনিংসের শেষ ১০ ওভারে ব্যাটসম্যানদের জন্য পরিস্থিতি আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠছে। পুরোনো বলে রিভার্স সুইং বেড়ে যাওয়ায় ডেথ ওভারে রান তোলার গতি কমছে, নতুন করে ভাবতে হচ্ছে ব্যাটিং কৌশল নিয়েও।
গত বছরের জুলাইয়ে চালু হওয়া নিয়ম অনুযায়ী, ইনিংসের ৩৪ ওভার শেষে অধিনায়ক দুই প্রান্তে ব্যবহৃত দুটি সাদা বলের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন। নির্বাচিত বলটি দিয়ে ইনিংসের বাকি সময় খেলা হয়।
এর আগে পুরো ইনিংসে দুই প্রান্ত থেকে দুটি আলাদা নতুন বল ব্যবহার করা হতো। নতুন নিয়মের উদ্দেশ্য ছিল বলের স্বাভাবিক ক্ষয় ও রিভার্স সুইংয়ের সুযোগ বাড়িয়ে বোলারদের আরও কার্যকর করে তোলা।
পুরোনো বলে বাড়ছে রিভার্স সুইং
ক্রিকেটে রিভার্স সুইং এমন একটি কৌশল, যেখানে পুরোনো বল বাতাসে প্রচলিত সুইংয়ের বিপরীত দিকে বাঁক নিতে পারে। বলের অবস্থা, গতি, বোলারের দক্ষতা এবং বাতাসের পরিস্থিতি—সবকিছুই এতে ভূমিকা রাখে।
দুটি নতুন বল ব্যবহারের পুরোনো নিয়মে প্রতিটি বল তুলনামূলক কম ব্যবহৃত হতো। ফলে ইনিংসের শেষ দিকে বলের ক্ষয় ও রিভার্স সুইংয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারত।
নতুন নিয়মে ৩৪ ওভারের পর একটি বল দিয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় বলের অবস্থা ও বোলিং কৌশল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিয়ম পরিবর্তনের পর ইনিংসের শেষ ১০ ওভারে ফাস্ট বোলারদের ফুল-লেংথ ডেলিভারির প্রায় অর্ধেক এক ডিগ্রির বেশি সুইং করেছে। আগের ১৮ মাসে এই হার ছিল ৩৫ শতাংশ।
শেষ পাঁচ ওভারে কমেছে রান তোলার গতি
নতুন নিয়মের প্রভাব দেখা যাচ্ছে বোলারদের পারফরম্যান্সেও। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইনিংসের শেষ পাঁচ ওভারে পেসারদের ইকোনমি রেট প্রতি ওভারে ৮.৪০ রান থেকে কমে ৭.৯৫ হয়েছে।
একই সময়ে তাদের বোলিং গড় ১৯.২ থেকে নেমে এসেছে ১৮.৩-এ।
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, ইনিংসের শেষ দিকে পেসাররা আগের তুলনায় বেশি কার্যকর হচ্ছেন। বিশেষ করে ফুল-লেংথ ডেলিভারি ও পুরোনো বলের মুভমেন্ট কাজে লাগিয়ে ব্যাটসম্যানদের বড় শট খেলা কঠিন করে তুলছেন তাঁরা।
তবে এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু নিয়মকেই একমাত্র কারণ বলা যায় না। পিচের অবস্থা, আবহাওয়া, বোলারদের দক্ষতা এবং ব্যাটিং দলের কৌশলও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইংল্যান্ডের হারেও আলোচনায় নতুন নিয়ম
হেডিংলিতে শ্রীলঙ্কার কাছে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ইংল্যান্ডের ১৬ রানের পরাজয়ের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ইংল্যান্ডের কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালামও বলের গুরুত্ব এবং খেলার পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে খেলোয়াড়দের সতর্ক করেন।
শ্রীলঙ্কা পুরোনো বলের মুভমেন্ট কাজে লাগিয়ে ইংল্যান্ডের ব্যাটিংকে চাপে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনা ওয়ানডে ক্রিকেটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—ইনিংসের শেষ দিকে বড় শটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ব্যাটিং দলগুলোকে কি প্রথম থেকেই আরও পরিকল্পিতভাবে রান তুলতে হবে?
কোন দলগুলো চাপে?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নিয়ম চালুর পর অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো দলের ইনিংসের শেষ দিকে রান তোলার গতিতেও পরিবর্তন দেখা গেছে।
বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্ষেত্রে শেষ ওভারগুলোতে রান তোলার হার প্রতি ওভারে ২.৩৯ রান কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে দলভেদে পরিবর্তনের মাত্রা এক নয়। তাই সব দলের পারফরম্যান্সকে একইভাবে বিচার না করে আলাদা করে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা জরুরি।
ব্যাটিং কৌশলে আসতে পারে পরিবর্তন
নতুন নিয়মের কারণে ওয়ানডে ক্রিকেটে ব্যাটিং পরিকল্পনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে প্রথম ৩৪ ওভারে বড় সংগ্রহ গড়ার পাশাপাশি শেষ দিকে পুরোনো বল সামলানোর প্রস্তুতিও নিতে হবে দলগুলোকে।
ব্যাটসম্যানদের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে:
- শুরুর ও মাঝের ওভারে রান তোলা: শেষ দিকে রান কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে প্রথম ৩৪ ওভারে ভালো ভিত্তি গড়তে হবে।
- বোলারের পরিকল্পনা বোঝা: পুরোনো বলে সুইংয়ের সম্ভাবনা বিবেচনা করে শট নির্বাচন করতে হবে।
- উইকেট ধরে রাখা: শেষ দিকে দ্রুত উইকেট পড়লে রিভার্স সুইংয়ের মুখে বড় সংগ্রহ গড়া কঠিন হতে পারে।
- বিকল্প ব্যাটিং কৌশল: শুধু বড় শট নয়, গ্যাপ খুঁজে রান নেওয়া এবং স্ট্রাইক বদলানোর দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
অন্যদিকে, বোলারদের জন্য পুরোনো বলের ব্যবহার, সঠিক লেংথ এবং সুইং কাজে লাগানোর দক্ষতা আরও মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বকাপের আগে বাড়ছে কৌশলগত গুরুত্ব
সামনে ওয়ানডে বিশ্বকাপ থাকায় নতুন নিয়মের প্রভাব দলগুলোর প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোন দল প্রথম ৩৪ ওভারে কতটা কার্যকরভাবে রান তুলতে পারছে এবং শেষ দিকে পুরোনো বলের বিপক্ষে কতটা ভালো খেলছে—এসব বিষয় ম্যাচের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে নতুন নিয়মের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে আরও বেশি ম্যাচের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। প্রাথমিক তথ্য বোলারদের পক্ষে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও, সব কন্ডিশন ও সব দলের ক্ষেত্রে একই ফল হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
সব মিলিয়ে, ওয়ানডে ক্রিকেটে নতুন বল ব্যবহারের নিয়ম ব্যাটিং ও বোলিংয়ের কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শেষ ১০ ওভারে শুধু শক্তির ওপর নির্ভর না করে দক্ষতা, ধৈর্য এবং পরিস্থিতি বুঝে খেলার ক্ষমতাই হয়ে উঠতে পারে সাফল্যের চাবিকাঠি।

