নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রিকেট
ভারতীয় নারী ক্রিকেট দলের নেতৃত্বে স্মৃতি মান্ধানার নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাট হাতে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিলেও অধিনায়ক হিসেবে তাঁর সামর্থ্যকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর সুযোগ ভারতীয় ক্রিকেটে খুব একটা দেখা যায়নি। তবে উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগে (ডব্লিউপিএল) রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে তিন মৌসুমে দুটি শিরোপা জেতানোর পর মান্ধানার নেতৃত্বগুণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৪ ও ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই ভারতের বিদায় নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে।
এবার পূর্ণকালীন ভারতীয় অধিনায়ক হিসেবে নিজের প্রথম দায়িত্বে নামতে চলেছেন মান্ধানা। ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সীমিত ওভারের সিরিজ দিয়েই শুরু হতে পারে তাঁর নতুন পথচলা। তবে এই দায়িত্বের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আগের অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌরের মতোই কি আক্রমণাত্মক ক্রিকেটের পথে হাঁটবেন তিনি? তরুণ ক্রিকেটারদের কীভাবে গড়ে তুলবেন? দলের মধ্যে কেমন পরিবেশ তৈরি করবেন? আর নেতৃত্বের বাড়তি চাপ তাঁর নিজের ব্যাটিংয়ে কতটা প্রভাব ফেলবে?
মান্ধানার অতীতের নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা থেকে এসব প্রশ্নের কিছু উত্তর পাওয়া যায়।
ডব্লিউপিএলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস দেখিয়েছেন মান্ধানা
২০২৬ সালের ডব্লিউপিএল শুরুর আগে বড় সমস্যায় পড়েছিল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। অস্ট্রেলীয় অলরাউন্ডার এলিস পেরি শেষ মুহূর্তে টুর্নামেন্টে না খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তাঁর বিকল্প খুঁজতে হয় দলকে। এমন পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ কোনো বিদেশি অলরাউন্ডারকে দলে নেওয়াই ছিল স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত।
কিন্তু মান্ধানা বেছে নিতে চেয়েছিলেন তুলনামূলক অপরিচিত ভারতীয় ক্রিকেটার সায়ালি সাতঘরেকে। নিলামে অবিক্রীত থাকা এই ক্রিকেটারকে দলে নেওয়ার পক্ষে ছিলেন তিনি। মান্ধানার যুক্তি ছিল, বেঞ্চে বসে থাকার মতো বিদেশি ক্রিকেটারের পরিবর্তে এমন একজন বোলারকে দলে রাখা প্রয়োজন, যাঁকে নিয়মিত ব্যবহার করা যাবে।
সেই সিদ্ধান্ত যে কতটা কার্যকর ছিল, তা মাঠেই প্রমাণ করেন সাতঘরে। বেঙ্গালুরুর শিরোপাজয়ী অভিযানে মাত্র ছয় ম্যাচে ৯ উইকেট নেন তিনি। তাঁর ইকোনমি রেট ছিল ৮.৭৫।
এখানেই শেষ নয়। দলের আরেক ক্রিকেটার রাধা যাদবের ব্যাটিং প্রতিভাও চিনতে পেরেছিলেন মান্ধানা। এত দিন রাধা মূলত বাঁহাতি স্পিনার ও দুর্দান্ত ফিল্ডার হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। ডব্লিউপিএলে তাঁর সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান ছিল ২৭।
কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে রাধার ব্যাটিং দেখে তাঁকে ছয় নম্বরে খেলানোর পরিকল্পনা করেন মান্ধানা। মুম্বাইয়ে অনুশীলনের জন্য আলাদা মাঠের ব্যবস্থাও করা হয়, যেখানে রাধা বড় শট খেলার দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পান।
এর ফল পাওয়া যায় ২০২৬ সালের ডব্লিউপিএল ফাইনালে। ২০৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে রাধা মাত্র পাঁচ বলে অপরাজিত ১২ রান করে বেঙ্গালুরুর জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শেষ পর্যন্ত দুই বল বাকি থাকতেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় দল।
তরুণদের পাশে দাঁড়ানোই মান্ধানার নেতৃত্বের অন্যতম শক্তি
মান্ধানার নেতৃত্বের বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি শুধু তারকা ক্রিকেটারদের ওপর নির্ভর করেন না। বরং দলের তরুণ ও অনালোচিত প্রতিভাদের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০২৩ সালে ডব্লিউপিএলের প্রথম আসরে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বেঙ্গালুরু। মান্ধানা নিজেও টুর্নামেন্টে একটিও অর্ধশতরান করতে পারেননি। পাঁচ দলের প্রতিযোগিতায় চতুর্থ স্থানে থেকে আসর শেষ করে দলটি।
এরপর নিজের খেলার উন্নতির পাশাপাশি ভারতীয় ঘরোয়া ক্রিকেটকে আরও কাছ থেকে বোঝার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সেই কারণে লাভজনক উইমেন্স বিগ ব্যাশ লিগের চুক্তি ছেড়ে ভারতীয় ঘরোয়া মৌসুমে খেলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন।
স্থানীয় ক্রিকেটারদের সম্পর্কে অন্যের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর না করে তাঁদের সরাসরি দেখেই সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিলেন মান্ধানা। অধিনায়ক হিসেবে দলকে সাফল্য এনে দেওয়ার জন্য তাঁর এই মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ভারতীয় দলের দায়িত্ব বেঙ্গালুরুর নেতৃত্বের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে দল নির্বাচন ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অধিনায়কের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সরাসরি হলেও জাতীয় দলে নির্বাচক ও কোচিং স্টাফের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ঘরোয়া ক্রিকেট সম্পর্কে মান্ধানার অভিজ্ঞতা এই জায়গায় তাঁকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
হরমনপ্রীতকে সামলে রাখাও বড় পরীক্ষা
নতুন অধিনায়ক হিসেবে মান্ধানার সামনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হবে সাবেক অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌরের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা।
দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দেওয়ার পর অন্য কারও অধীনে খেলতে গিয়ে অনেক ক্রিকেটারই মানিয়ে নিতে সমস্যায় পড়েন। তবে ভারতীয় দল ও ডব্লিউপিএলে মান্ধানার সঙ্গে কাজ করা ব্যক্তিরা তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং সতীর্থদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির দক্ষতার প্রশংসা করেছেন।
তরুণ ক্রিকেটারদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও মান্ধানা বারবার নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
২০২৪ সালের ডব্লিউপিএলের আগে শ্রীয়াঙ্কা পাতিল কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। কর্ণাটক রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার সঙ্গে কিছু সমস্যার কারণে রাজ্য দলে জায়গা হারিয়েছিলেন তিনি। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া শ্রীয়াঙ্কাকে মান্ধানা মনে করিয়ে দেন, বেঙ্গালুরুর হয়ে তাঁর দেওয়ার মতো অনেক কিছুই রয়েছে।
অধিনায়কের সেই আস্থা মাঠে কাজে লাগান শ্রীয়াঙ্কা। ২০২৪ সালের ডব্লিউপিএলে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হয়ে পার্পল ক্যাপ জেতেন তিনি। একই সঙ্গে বেঙ্গালুরুর শিরোপাজয়ী অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
লেগস্পিনার আশা শোভনাকেও বড় স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন মান্ধানা। শুধু ডব্লিউপিএলে খেলার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় দলের হয়ে খেলার লক্ষ্য স্থির করতে বলেছিলেন তাঁকে।
২০২৪ সালে বেঙ্গালুরুর শিরোপাজয়ী অভিযানে ১২ উইকেট নেওয়া আশা পরে ভারতীয় দলের হয়ে অভিষেকের সুযোগ পান। তাঁর হাতে জাতীয় দলের ক্যাপ তুলে দেওয়ার মুহূর্তটিও মান্ধানার নেতৃত্বের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে।
বিশ্বকাপ জয়ে তরুণদের চাপমুক্ত রেখেছিলেন মান্ধানা
তরুণ ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর আরেকটি উদাহরণ প্রাতিকা রাওয়াল। ওয়ানডে ক্রিকেটে তাঁর স্ট্রাইক রেট নিয়ে সমালোচনা হলেও মান্ধানা তাঁকে সমর্থন করেছিলেন।
২০২৫ সালের নারী ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারতের সফল অভিযানের সময় রাওয়ালের ওপর থেকে চাপ কমাতে পাওয়ারপ্লেতে নিজেই বেশি ঝুঁকি নিয়ে খেলেছিলেন মান্ধানা। এর ফলে রাওয়াল ক্রিজে থিতু হওয়ার এবং নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলার সুযোগ পান।
একজন অধিনায়কের দায়িত্ব শুধু দলের পরিকল্পনা তৈরি করা নয়, বরং সতীর্থদের নিজেদের সেরাটা দেওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি করাও। মান্ধানার নেতৃত্বে এই দিকটি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।

টি-টোয়েন্টিতে ভারতের খেলার ধরন বদলাতে হবে
সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়া কাপ ও এশিয়ান গেমসের মতো প্রতিযোগিতায় সাফল্য পেলেও আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ভারতীয় নারী দলের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ২০২০ সালের পর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দলগুলোর বিপক্ষে জয় না পাওয়ার বিষয়টি ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ।
বিশ্ব ক্রিকেটের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে হলে ভারতের খেলার ধরনেও পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে ব্যাটিং অর্ডারে নির্দিষ্ট ভূমিকা নিশ্চিত করা, পাওয়ারপ্লেতে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে উন্নতির সুযোগ রয়েছে।
তিন নম্বর পজিশনে কে খেলবেন, তা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অনিশ্চয়তা দেখা গেছে। বড় টুর্নামেন্টে এমন সিদ্ধান্তহীনতা দলের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন অধিনায়ক হিসেবে মান্ধানার প্রথম কাজগুলোর একটি হতে পারে প্রতিটি ক্রিকেটারের ভূমিকা স্পষ্ট করে দেওয়া। কে ইনিংস গড়বেন, কে দ্রুত রান তুলবেন এবং চাপের মুহূর্তে কার ওপর দায়িত্ব থাকবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সামনে কঠিন পরীক্ষার অপেক্ষা
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঘরের মাঠের সিরিজ মান্ধানার জন্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক শুরু হতে পারে। তবে প্রকৃত পরীক্ষা অপেক্ষা করছে বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলোতে।
২০২৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, ২০২৮ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিককে সামনে রেখে ভারতীয় দলকে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
২০২৫ সালের বিশ্বকাপের আগে নিজের ফিটনেস ও শারীরিক সক্ষমতা উন্নত করতে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন মান্ধানা। তাঁর সেই প্রস্তুতি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে বদলে নেওয়ার মানসিকতা অধিনায়ক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ভারতীয় ক্রিকেটে স্মৃতি মান্ধানা ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত তারকা। এবার তাঁর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ—নিজের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি পুরো দলকে এগিয়ে নেওয়া। তরুণ প্রতিভাদের সঠিকভাবে ব্যবহার করা, অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারলে ভারতের নারী ক্রিকেটে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারেন তিনি।

